বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দল বিএনপি। বর্তমান সময়ে দলটি এক সংকটাপন্ন পরিস্তিতির মধ্যে পতিত হয়েছে। এমনকি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে অস্থিতিশীল পরিবেশ। তবে এবার নতুন করে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ এবং বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের কর্মকাণ্ডকে ঘিরে চিন্তিত হয়ে পড়েছে বিএনপি দল।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম) ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের (বীর প্রতীক) কর্মকাণ্ডে চিন্তিত তাদের ২০ দলীয় জোটের নেতৃস্থানীয় দল বিএনপি। জোটের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন, কর্মসূচির আয়োজন ও বক্তব্য-বিবৃতিতে তারা আলোচনায় থাকলেও এ নিয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বের একাংশে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও আড়ালে কেউ কেউ ক্ষোভও প্রকাশ করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে এমনিতেই সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনকেন্দ্রিক অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত, ২০ দলীয় জোট থাকা সত্ত্বেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে আরেকটি জোট গঠন এবং এ নিয়ে জোটেই অসন্তোষ, দুর্নীতির মা/ম/লা/য় কা/রা/গা/রে যাওয়া দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়তে না পারা এবং পরে সরকারের অনুকম্পায় তার মুক্তিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০ দলীয় জোটের বাইরে গিয়ে কিছু দলকে নিয়ে অলি আহমদ ও সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের নেতৃত্বে ’জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’ গঠন, দোয়া মাহফিলের নামে রাজনৈতিক নেতা ও সমমনা বুদ্ধিজীবীদের সম্মেলন আয়োজন, কূটনীতিক ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে ডিনার পার্টির আয়োজন এবং বিভিন্ন ইস্যুতে বক্তব্য-বিবৃতি বিএনপিকে ফেলেছে আরও চাপে। দলটির কতিপয় নেতা মনে করেন, অলি-ইবরাহিমের সামনে আসার এ প্রচেষ্টা বিএনপির নেতৃত্বকে কোণঠাসা করারই নামান্তর। কেউ কেউ তাদের তৎপরতাকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের প্রতি ’চ্যালেঞ্জ’ হিসেবেও দেখছেন।

পুরনো দ্বন্দ্ব ও অলিকে নিয়ে শঙ্কা
রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে তারেক রহমানের সঙ্গে মতবিরোধ লেগেই ছিল সেসময়কার বিএনপি নেতা অলি আহমদের। ওই বিরোধের জেরেই তিনি বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করেন। সেজন্য বিএনপিতে তারেকের অনুসারীরা অলি আহমদকে কখনোই আস্থায় রাখেন না। তারা মনে করেন, অলি আহমদ সুযোগ পেলে তারেক রহমানকে ’মা/ই/না/স’ করে দেবেন। অলিকে নিয়ে তারেকের অনুসারীদের ওই চিন্তা ভিত পাচ্ছে তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে। যদিও তারেক রহমানের সমালোচক শিবির মনে করে, সরকারের ভেতরের প্রভাবশালী মহল তারেককে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বিএনপির নেতৃত্বে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। কারণ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তাদের সমাবেশে গ্রে/নে/ড হা/ম/লা/র জন্য তারেক রহমানকেই দায়ী করে থাকে। সুতরাং আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই তাকে রাজনীতিতে জায়গা দিতে রাজি নয়। সেক্ষেত্রে বিএনপি এবং এর জোট থেকে নতুন কাউকে পথ দেখাতে হবে।

এরই অংশ হিসেবে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী অলি আহমদকে নিয়ে দলটির নেতৃত্বের একটি অংশ কাজ করতে আগ্রহী। সেজন্য কিছু দিন ধরে তিনি আলাদাভাবে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রাজধানীর গুলশানের একটি বাড়িতে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করেছেন অলি আহমদ। অবশ্য অলি-ইবরাহিমকে সন্দেহের জায়গা থেকে ভেতরে ভেতরে তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপিও। মনে করা হয়, এলডিপি ও কল্যাণ পার্টির নেতৃত্বে ২০১৯ সালের ২৭ জুন জাতীয় মুক্তিমঞ্চ গঠন হওয়ার পর ওই দুই দলসহ সেই জোটের শরিক দলগুলোতে যে ভাঙন দেখা গিয়েছে, সেটা বিএনপির ইশারায়ই হয়েছে। যে কারণে মুক্তিমঞ্চকে পরিপূর্ণ প্লাটফর্ম দাবি করতে পারছেন না এর উদ্যোক্তারা।

আলোচনায় সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের দোয়া মাহফিল
মুক্তিমঞ্চ নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ডের ধাঁধা না কাটতেই গত ১৬ জানুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁয় ’দোয়া অনুষ্ঠান’র আয়োজন করেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম। সেখানে ২০ দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি দলের নেতা এবং সমমনা বুদ্ধিজীবীর উপস্থিতি ও বক্তব্য বিএনপির হাইকমান্ডকে ভাবনায় ফেলে দেয়। ওই অনুষ্ঠানে অলি আহমদ উপস্থিত না থাকলেও আয়োজনটির পেছনের কুশীলব তাকেই মনে করছেন বিএনপির নেতারা।

এমনকি ওই কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারিতে একটি ডিনার পার্টির আয়োজনের খবর ছড়িয়েছে, যেখানে কূটনীতিক ও বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি বিএনপি নেতাদের একটি অংশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অলি-ইবরাহিমের নতুন বলয়ের সঙ্গে যুক্ত একজন রাজনীতিক নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, চলমান দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি, পরিবারতন্ত্র ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিষ্ক্রিয়তায় তারা একটি সরকারবিরোধী নতুন প্লাটফর্ম তৈরি করছেন। বিএনপির বিকল্প হিসেবে দলের কারাদণ্ডিত দুই শীর্ষ নেতাকে (খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান) পাশ কাটিয়ে নতুন জাতীয়তাবাদী শক্তি গড়ে তোলাই তাদের উদ্দেশ্য।

জোট জোটের জায়গায়
অলি আহমদ ও সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমকে ঘিরে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান বলেন, ’এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। আমার সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। তারা তো এখনো ২০ দলীয় জোটেই আছেন।’ ২০ দলীয় জোটের বর্তমান অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’জোট জোটের জায়গায় আছে। সম্প্রতি আমরা দুটো মিটিংও করেছি।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, ’যারা সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমকে পছন্দ করেন না তারা এই ধরনের (সমালোচনা) কথা বলে থাকেন। যারা চান না সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম রাজনীতিতে থাকুক তারা এ ধরনের কথা বলছেন। আগামী নির্বাচনে আমরা ২০০ আসনে প্রার্থী দেবো।’ তাহলে কি আপনারা জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন না, এমন প্রশ্নে সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, ’আমরা যদি ২০০ আসনে প্রার্থী দেই, আমরা নিশ্চিত করতে পারি, আমাদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন হবে। জোট আছে।’ যোগাযোগ করলে ড. অলি আহমদ ’ব্যস্ততা’ দেখিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

বর্তমান সময়ে বিএনপি দলের অসংখ্য নেতাকর্মী বিভিন্ন ধরনের মামলার শিকার হয়েছে। এমনকি অনেকেই করাগারে বন্দী জীবন-যাপন করছে। দীর্ঘ সমসয় ধরে এই দলটি ক্ষমতার বাইরে থাকায় এমন পরিস্তিতি বিরাজ করছে দলটিতে। তবে দলীয় নেতাকর্মীরা দলের চলমান সকল সংকট নিরসনের জন্য আপ্রান ভাবে চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে নেতাকর্মীরা নানা ধরনের পদক্ষেপও গ্রহন করেছে।