বিজয় কিবোর্ড হল মাইক্রোসফট উইন্ডোজ, ম্যাক ওএস এবং লিনাক্স-এ গ্রাফিক্যাল লেআউট পরিবর্তক এবং ইউনিকোড ও এএনএসআই সমর্থিত বাংলা লেখার সফটওয়্যার। বিজয় এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালে যা ইউনিকোড ভিত্তিক অভ্র কী-বোর্ড আসার পূর্বপর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত হয়েছে। ইউনিকোড পরিপূর্ণভাবে প্রচলনের স্বার্থে বিজয় এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। প্রথম সংস্করণের সকল বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে দ্বিতীয় সংস্করণে এমন কিছু নতুন বর্ণ যুক্ত করা হয় যা ইউনিকোড ভিত্তিক বাংলা লেখার জন্য প্রয়োজন হয়। প্রকৃতপক্ষে বিজয় এর দ্বিতীয় সংস্করণ সম্পূর্ণ প্রয়োগ করা হয়েছে বিজয় এর ইউনিকোড এবং গোল্ড সংস্করণে।
\’বিজয় বাংলা কীবোর্ড\’ জাতীয় প্রমিত মানের কীবোর্ড হিসেবে সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হওয়ায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি এই কীবোর্ড ব্যবহার করে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। মন্ত্রী স্ট্যাটাসে লিখেছেন, \’বিজয় বাংলা কীবোর্ড ৩.০ এখন জাতীয় প্রমিত মান। যেটির বিডিএস নাম্বার ১৭৩৮:২০১৮। সরকারি নিয়ম অনুসারে কেবলমাত্র এই কীবোর্ডই সর্বত্র ব্যবহৃত হবার কথা। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং কেবিনেট ডিভিসন তেমন নির্দেশনা দিয়েছেন। বাংলাদেশে আর কোনো কীবোর্ড এর সরকারি স্বীকৃতি নেই। সবাই প্রমিত মান মেনে চলুন। সরকারি চাকরিতে পরীক্ষা হবে এই কী বোর্ডেই। এখন পর্যন্ত বিজয় ছাড়া এসব মানসম্মত আর কোনো কী বোর্ড বা সফটওয়্যার বাংলাদেশে নেই।\’

মন্ত্রীর এই স্ট্যাটাসের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন অনেকেই।

এ প্রসঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সালাউদ্দিন সেলিম তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।পাঠকদের জন্য স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

\’বিজয় বাংলা কীবোর্ড এখন সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জাতীয় প্রমিত মানের কীবোর্ড। নিঃসন্দেহে খুব বড় একটি সুসংবাদ। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী বলেছেন- \’সরকারি নিয়ম অনুসারে কেবলমাত্র এই কীবোর্ড-ই সর্বত্র ব্যবহার হবার কথা\’। জাতির কাছে প্রশ্ন -\’\’আমরা কি খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজ সব কিছুই কি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী করি?\’ এটা নিয়ে ভয় পাওয়ার একটি কারণ আছে- সেটা হলো \’এক সময় \’ইউনিজয় (Unijoy)\’ নামে একটি ওপেন সোর্স \’বাংলা কীবোর্ড\’ ছিল যার ডেভেলপমেন্টে কাজ করতো অনেক মেধাবী ছেলেমেয়ে। মেধাবীদের মেধা বিকাশে এবং নিত্যনতুন সৃষ্টিতে এই ওপেন সোর্স প্ল্যাটফর্ম বিশ্বব্যাপী সমাদিত। সেই ওপেনসোর্স প্ল্যাটফর্মের \’ইউনিজয় বাংলা কীবোর্ড\’ টিকে আইন করে কোর্ট অর্ডার নিয়ে তাদেরকে নাকানিচুবানি খাইয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল বিজয় কীবোর্ড কর্তৃপক্ষ। বিজয় কী-বোর্ড কর্তৃপক্ষ দেশে ডেভেলপার তৈরি করার কাজে কখনোই সহায়ক ছিল না, তারা শুধু ব্যবসা চিনে, বিজয় ছাড়া অন্য কেউ দেশে বাংলা কীবোর্ড নিয়ে কাজ করবে এটা তারা মেনে নিতেই পারেন না।

তাই ভয় হয় সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিজয় কীবোর্ডটি যেন নিয়ম না হয়ে আবার আইন হয়ে যায়- অর্থ্যাৎ এমনও হতে পারে বিজয় কীবোর্ড ছাড়া অন্য কোন কীবোর্ড ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে, মোবাইলকোর্ট বসিয়ে জরিমানা আদায় করা হবে। সর্বত্র কোন কী-বোর্ড ব্যবহৃত হবে- সেটা চাপিয়ে দেওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়, ব্যবহারকারীরা যে যেটা ব্যবহার করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে তারা সেটাই করবে। একটা কীবোর্ড সফটওয়ারে প্রমিত মান কিংবা স্বীকৃতির কিছু নেই, বিজয় এর ডেভেলপাররা এমন কোন ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করেন না যা অতি মাত্রায় আধুনিক অন্যকেউ পারে না, কিবোর্ডের বাটন তৈরিতে এমন কোন প্লাস্টিক ব্যবহার করেন না যেখানে হালাল-হারামের ব্যাপার আছে...।

যদিও আমি গত ২০ বছর ধরে বিজয় কীবোর্ড ব্যবহারকারী কিন্তু আমি চাই বাংলা কীবোর্ড নিয়ে দেশে আরও মেধাবিরা কাজ করুক, কারণ বাংলা ল্যাংগুয়েজকে ম্যাশিন ল্যাংগুয়েজে কাজ করাতে হলে এখনো প্রচুর গবেষণা বাকী, তাই বিজয়দের ভয়ে ইউনিজয় এর মতো আর কেউ যেন থেমে না যায়...।

উল্লেখ্য, মোস্তাফা জব্বার প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও চলমান শেখ হাসিনার চতুর্থ মন্ত্রিসভার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি। তিনি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সাবেক সভাপতি। তার প্রতিষ্ঠানের বিজয় বাংলা কিবোর্ড ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় যা ইউনিকোড ভিত্তিক অভ্র কী-বোর্ড আসার পূর্বপর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সাধারণ বিষয়ের ওপর অনেকগুলো বইয়ের লেখক তিনি। তথ্যপ্রযুক্তি জগতে বাংলা ভাষা জনপ্রিয়করণে জব্বার একজন পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হন।