গোটা বিশ্ব জুড়ে প্রথম সারির আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। অবশ্যে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ হিসেবে অন্যান্য সকল দেশের এই নির্বাচনকে ঘিরে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। তবে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে ব্যপক মাত্রায় আলোচনার-সমালোচনার তুঙ্গে রয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়াই করা প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন। এমনকি বিশ্বের অনেক নামি-দামি গনমাধ্যম গুলোও এই দুই প্রার্থীকে নিয়ে নানা জরিপে মেতে উঠেছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুলও একটি মতামত প্রকাশ করেছেন।
কে জিতবেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে? ফেসবুকে বন্ধুদের মন্তব্য ট্রাম্প। বিদেশের গণমাধ্যমে বিশ্লেষকদের বক্তব্য, বাইডেনের সম্ভাবনা বেশি, তবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না কিছু। সবার মনে গেঁথে আছে ২০১৬ সালে ট্রাম্পের অবিশ্বাস্য বিজয়ের কথা। পেনসিলভানিয়া, মিশিগান আর উইসকনসিন—১৯৭২ সালে থেকে ডেমোক্র্যাটদের নিশ্চিত দুর্গগুলোতে ট্রাম্পের বিজয় ছিনিয়ে আনার কথা। আমার মনে পড়ে ২০১৬ সালে নির্বাচনের আগে দেশ–বিদেশের প্রায় সব বিশ্লেষকের লেখায় পড়েছি হিলারি জিতবেন। তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম আমি। ৪ নভেম্বরে হতবাক করা একের পর এক ফলাফল আসার পর ট্রাম্পের বিজয় নিয়ে প্রথম আলোয় লিখলাম ’চক্ষু চড়কগাছ’! এবার বলতে পারি, এবার চক্ষু চড়কগাছ হতে পারে অন্যভাবে। সেটি হচ্ছে, ট্রাম্পের বিশাল পরাজয়ে। অন্তত স্পস্ট ব্যবধানে পরাজয়ে।

প্রথমে বলে নিই আমার এ আত্মবিশ্বাসের কারণ বিবিসি। বিবিসিতে ’প্রেডিক্ট ইয়োর প্রেসিডেন্ট’ নামে একটা গেম আছে। সেখানে বিবিসি নানা বিবেচনায় ব্যাটল গ্রাউন্ড স্টেট হিসেবে সাতটি রাজ্য বাছাই করেছে, যেখানকার ফলাফল নির্ধারণ করবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের হারজিত। বিবিসির প্রেডিকশনের খেলাটা শুরু হয় বাইডেন ২৩৩ ও ট্রাম্প ১৮৮টি ইলেকটোরাল ভোট পাবেন, তা নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়ে। এটি ধরে নেওয়ার কারণ কলাম্বিয়া ডিস্ট্রিক্ট এবং ১৮টি নীল দেয়াল বা ব্লু ওয়াল স্টেট, যেখানে মোট ইলেকটোরাল ভোট হচ্ছে ২৪২। ১৯৯২ থেকে ২০১৬ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এর প্রতিটি স্টেটে জিতেছেন ডেমোক্র্যাটরা, যেমন বিগ থ্রি স্টেট ক্যালিফোর্নিয়া (ইলেকটোরাল ভোট ৫৫), নিউইয়র্ক (২৯) আর ইলিনয়েস (২০)। এর পাশাপাশি রেড ওয়াল হচ্ছে সেসব রাজ্য, যেখানে ২০০৮ সালে ওবামার বিজয় বাদে রিপাবলিকানরা একচেটিয়াভাবে জিতে আসছেন কয়েক দশক ধরে। যেমন আইওয়া, ওহাইও, টেক্সাস। এসব রাজ্যে এবারও ট্রাম্প এগিয়ে জরিপে। নীল দেয়ালের ইলেকটোরাল ভোট লাল দেয়ালের চেয়ে বেশি। ফলে বিবিসির হিসাবে বাইডেন নিশ্চিত এগিয়ে ২৩৩টি আসনে, অন্যদিকে ট্রাম্প ১৮৮টিতে।

এবার আসি প্রেডিকশন গেমে। এখানে বিবিসির বাছাই করা ৭টি ব্যাটল গ্রাউন্ড রাজ্যের মধ্যে উইসকনসিন ও মিশিগানে বাইডেনের বিজয় নিশ্চিত বলে আমার ধারণা। উইসকনসিনে (১০) দুই বছর আগে ডেমোক্র্যাটদের গভর্নর পদে বিরাট বিজয়ের পর থেকে এ সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। ট্রেড ওয়ারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসার মধ্যে একটি হচ্ছে, এর ডেইরি ফার্মগুলো। এ ছাড়া ব্ল্যাক রাইটস মুভমেন্টের জোয়ারও এখানে বাইডেনের পক্ষে যাবে। এখানে বাইডেন জরিপে এগিয়ে বিরাট ব্যবধানে। একই অবস্থা ২৮ বছর ধরে ডেমোক্র্যাটদের রাজ্য মিশিগানে। ২০১৬ সালে এখানে ট্রাম্পের বিজয় ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩ ব্যবধানে। কিন্তু বাইডেন এখানে ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয়, এখানকার অতি জনপ্রিয় ডেমোক্র্যাট গভর্নরের সঙ্গে রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক। এই স্টেট দুটির ২৬টি ভোট যোগ হলে বাইডেনের ভোট হয় ২৫৯। বাকি রাজ্যগুলোর মধ্যে পেনসিলভানিয়াতে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ল্যাটিনো পরিবারদের তাদের শি/শু/দের চেয়ে আলাদা করা, কালোদের ওপর পু/লি/শি নি/র্যা/ত/ন, বেকারত্ব ও করোনার অসমানুপাতিক প্রভাব এখানে ট্রাম্পের বিপক্ষে যাবে। এখানকার একটি অঞ্চলে জন্ম নেওয়া বাইডেনের রয়েছে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। এখানকার ২০টি ভোট পেলে তাঁর মোট ভোট দাঁড়ায় ২৭৯। প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেয়েও ৯ বেশি।

এ ছাড়া ফ্লোরিডাতেও তাঁর জয়ের সম্ভাবনা আছে। ফ্লোরিডা ট্রাম্পের অ্যাডাপটেড সেকেন্ড হোম। কিন্তু এখানে অন্য রাজ্য থেকে আসা পেনশনাররা আর তরুণ ভোটাররা বাইডেনের পক্ষে বেশি, এখানে তাঁর পক্ষে অতি জনপ্রিয় ওবামা নিজে কাজ করছেন। করোনা আর বেকারত্বের প্রভাব পেনসিলভানিয়ার মতো এখানেও আছে। ফ্লোরিডার ২৯টি ভোট পেলে বাইডেনের বিশাল বিজয় নিশ্চিত হয় ৩০৮ ভোটে!
বিবিসির বাছাই করা রাজ্যগুলোর মধ্যে বাকি তিনটিতে ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অ্যারিজোনা (১১), উত্তর ক্যারোলাইনা (১৫) আর জর্জিয়াতে (১৬) তিনি জিতলেও তাঁর মোট ভোট হবে মাত্র ২৩০ (১৮৮+৪২)। অর্থাৎ জিতবেন বাইডেন। এত বড় গলায় এটি বললাম অনেকটা বিবিসির ওপর নির্ভর করে। এটা না হলে বিবিসির দোষ। হলে কিছুটা আমারও কৃতিত্ব! কারণ, ভবিষ্যদ্বাণীটা আমার। অতিমারি, অভাবিত মন্দা, জাতিগত বিভেদের এমন অভূতপূর্ণ পরিবেশের নির্বাচনে কয়জনের সাহস আছে, এমন ভবিষ্যদ্বাণী করার!

প্রসঙ্গত, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়াই করা অন্যতম দুই প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন দুজনেই নিজ নিজ অবস্থানে এই লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে খুবই আশাবাদী। তবে তবে ভোট কার্য সম্পন্ন হওয়ার পরই চূড়ান্ত ভাবে প্রকাশিত হবে বিজয়ী প্রার্থীর নাম। তবে বিশ্বের সকল দেশেই অধীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষায় রয়েছে এই ফলাফলের দিকে।

Sites