বর্তমান সময়ে দেশে হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে প্রাননাশকারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমন। অবশ্যে ভাইরাসটি দেশের সকল জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। তবে কয়েকটি জেলায় এই ভাইরাসে আক্রান্তের হার মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এবার প্রকাশ্যে এলো দেশের কোন অঞ্চল করোনা রোগী বৃদ্ধির হারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। কিছুদিন ধরে প্রায় সব জেলাতেই নতুন রোগী বাড়ছে। এর মধ্যে এখন রোগী বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি বরিশাল অঞ্চলে। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার সব কটিতেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হারও তুলনামূলক বেশি। রোগী বৃদ্ধি ও শনাক্তের হার বরিশালের পর বেশি দেখা যাচ্ছে ঢাকা ও খুলনায়। দেশের ৬৩ জেলার সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে পাওয়া গত দুই সপ্তাহের (১৩ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ) করোনা সংক্রমণের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিনিধিরা ওই তথ্য সংগ্রহ করেছেন। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দেশে করোনা সংক্রমণ লক্ষণীয়ভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনরা বলছেন, কিছুদিন ধরে মানুষজনের মধ্যে মাস্ক ব্যবহার করা বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে অনীহা তৈরি হয়েছে। জনসমাগমও স্বাভাবিক সময়ের মতো হয়ে গেছে। এগুলোই সংক্রমণ আবার বেড়ে যাওয়ার কারণ বলে তাঁরা মনে করছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুরু থেকে বরিশাল অঞ্চলে রোগী কম। এখন মোট শনাক্ত রোগীর ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ বরিশাল বিভাগের। কিন্তু গত এক সপ্তাহের হিসাব বলছে, এ দফায় বরিশাল অঞ্চলে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। সারা দেশে ২০–২৬ মার্চ এই এক সপ্তাহে তার আগের সপ্তাহের তুলনায় (১৩–১৯ মার্চ) রোগী বেড়েছিল ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে বরিশালের জেলাগুলোতে রোগী বৃদ্ধির হার ছিল ১০০ থেকে ৪৬২ শতাংশ। ২০-২৬ মার্চ এই এক সপ্তাহে সারা দেশে রোগী শনাক্তের হার ছিল ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর এ সময়ে বরিশাল অঞ্চলের ছয় জেলার পাঁচটিতে রোগী শনাক্তের হার ছিল সাড়ে ১৪ থেকে ৩৪ শতাংশ। অবশ্য বরিশাল বাদে অন্য জেলাগুলোতে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কম। বরিশাল জেলায় গত এক সপ্তাহে (২০-২৬ মার্চ) নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১২৪ জন। শনাক্তের হার ২০ শতাংশ। অথচ তার আগের সপ্তাহে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৪২ জন, শনাক্তের হার ছিল ১৪ শতাংশ।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, এখন সংক্রমণ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে আবার আগের মতোই জনসমাগম, মাস্ক না পরা এবং করোনার লক্ষণ থাকলেও অনেকে পরীক্ষা না করিয়ে ঘুরে বেড়ায়—এসব কারণে সংক্রমণ আবার বাড়ছে। তাঁরা জনগণকে নানাভাবে সচেতন করার চেষ্ট করছেন, কিন্তু তা উপেক্ষিত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে।

যেখানে সংক্রমণ বেশি

শুরু থেকেই দেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃ/ত্যু বেশি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। মোট রোগীর প্রায় ৫৭ শতাংশ এ বিভাগের। এর বড় অংশই আবার রাজধানী ঢাকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট শনাক্ত রোগীর ৫১ শতাংশ রাজধানীর বাসিন্দা। আর মোট মৃ/ত্যু/র ৩০ শতাংশই হয়েছে রাজধানীতে। রাজধানীর বাইরে এখন কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী ও শরীয়তপুরে রোগী শনাক্তের হার বেশি। গত এক সপ্তাহে এসব জেলায় শনাক্তের হার ১৫ শতাংশের ওপরে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরেও বাড়ছে নতুন রোগী। গত এক সপ্তাহে পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ২০ শতাংশের বেশি ছিল ৮টি জেলায়। সেগুলো হলো মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, নড়াইল, ভোলা, বরিশাল, ঝালকাঠি ও নাটোর।

ঢাকা বিভাগের পর সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগে। এখানকার চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, কক্সবাজারসহ সব জেলাতেই নতুন রোগী বাড়ছে। চট্টগ্রামে গত এক সপ্তাহে ১ হাজার ৬৬৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের চেয়ে ৫৩৭ জন বেশি। কক্সবাজারে এই সপ্তাহে (২০–২৬ মার্চ) রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৭৫ জন। আগের সপ্তাহে এখানে শনাক্ত হয়েছিল ৯২ জন। কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন মাহবুবুর রহমান বলেন, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজারে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন দৈনিক তিন থেকে পাঁচজনের করোনা শনাক্ত হতো। মার্চে কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকের ঢল নামায় সংক্রমণও বেড়েছে। দৈনিক সর্বোচ্চ ৩৮ জন রোগী হয়েছে। সংক্রমণ রোধে পর্যটকদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাক্স পরা বাধ্যতামূলক করাসহ হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানোসহ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা করোনা নিয়ন্ত্রণ কমিটি।

খুলনা বিভাগের পাঁচটি জেলায় শনাক্তের হার ১৫ শতাংশের বেশি। সিলেটেও রোগী দ্রুত বাড়ছে। এ জেলায় গত সপ্তাহে ৩২৩ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। আগের সপ্তাহে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৭১ জন। তবে এখানে রোগী শনাক্তের হার এখনো ১০ শতাংশের নিচে আছে। দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ চূড়ায় (পিক) উঠেছিল গত বছরের জুন–জুলাই মাসে। ওই সময়টায় বিশেষ করে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। বেশ কিছুদিন পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকার পর এক মাসের বেশি সময় ধরে সংক্রমণ আবার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে ছয় দিন ধরে সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী শনাক্তের খবর দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ২২ হাজার ১৩৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯০৮ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত আরও ৩৫ জনের মৃ/ত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭১৪ জনের রো/গ শ/না/ক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৯০৪ জনের মৃ/ত্যু হয়েছে। সুস্থ হয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৯৪১ জন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরামর্শক মুশতাক হোসেন বলেন, দেশের সব জেলাতেই সংক্রমণ বাড়ছে। যত দ্রুত বেশিসংখ্যক মানুষকে টিকা দেওয়া যাবে, মৃ/ত্যু/র শঙ্কা তত কমবে। এখন শ/না/ক্ত রোগীদের আইসোলেশন (বিচ্ছিন্ন রাখা) এবং তাঁদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এটি যথাযথভাবে হচ্ছে না। বদ্ধ কক্ষে বড় জমায়েত থেকে সং/ক্র/ম/ণ বেশি ছড়ায়। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশ সরকার এই ভাইরাস থেকে পরিত্রান পেতে ভারত থেকে ভ্যাকসিন আমদানি করে প্রয়োগ শুরু করেছে। এমনকি ইতিমধ্যে দেশের অধিকাংশ মানুষ এই টিকা গ্রহন করেছে। শুধু বাংলাদেশই নয় বিশ্বের বেশ কিছু দেশ এই ভাইরাস থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবহার শুরু করেছে। তবে ভ্যাকসিনের পাশাপাশি এই ভাইরাস থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতার কোন বিকল্প নেই।